গলার চেইন, নাকের ফুল দিয়েও নাফ নদী পার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা

0
2700

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা অমানবিক নির্যাতনের মুখে থেকে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসা রাখাইন রাজ্যে থেকে প্রতিদিনই পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গরা। গত শুক্রবার সকাল থেকেই রাখাইন কাদিচিল এলাকা আগুনে পুড়িয়ে দেয় মগ এবং সেনাবাহিনীরা। ধরে নিয়ে যায় তিনশত রোহিঙ্গাকে। যাদের এখনো কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

নগদ টাকা না থাকায় নদী পারাপারের জন্য গলার চেইন এবং নাকের ফুল দিয়ে নৌকা পারাপার করে দিচ্ছে কয়েকটি দালাল চক্র। তবুও একটু প্রাণে বাঁচার আশায় সব সম্বল বিক্রি করে নিজ দেশ থেকে পালিয়ে আসছেন নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। শনিবার সকালে শাহপরীর দ্বীপে কয়েকজন রোহিঙ্গা শরণার্থীরদের সঙ্গে কথা বলে এমনি তথ্য জানা যায়।

মিয়ানমারের নাফ নদীর পাশেই কাদিচিল এলাকা থেকে আসেন সাইফুল ইসলাম। কত টাকা দিয়ে এসেছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, আমার কাছে কোন টাকা ছিল না নৌকা পার হওয়ার। তাই টাকা না থাকায় আমার স্ত্রীর গলার চেইন ও কানের দুলের বিনিময়ে আমি আমার সন্তাদের এবং আমার গবাদিপশু গরু নিয়ে এসেছি। তিনি বলেন, কেউ আমার গরু ১৫ হাজারের উপরে বলে না। গরুর দাম ৫০ হাজার টাকা বলে দাবি করেন ৫০ বছরের এ বৃদ্ধা। একইভাবে রোহিঙ্গাদের গবাদিপশু গরু, ছাগল কম দামে কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে কয়েকটি দালাল চক্র। ২০ হাজার টাকার গরু মূল্য ৭ হজার টাকা। আর ১০-১৫ হাজার টাকার ছাগলের মূল্য ৫ হাজার টাকা। কোনো রকমে জীবন বাঁচিয়ে নাফ নদী পেরিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপে চলে আসা বার্মার কাদিচিল এলাকার চেয়ারম্যান মো. আনেরায়ার হোসেন এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, আমার এলাকা কাদিনিচিলে তিন’শ ঘর রয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে মগদের সেই ঘর, মসজিদ, মাদ্রাসায় আগুন লাগিয়ে দেয়। তাদেরকে বাধে দিতে গেলে তারা (মগ) মিলিটারি নিয়ে এসে এবং তারা আমার এলাকা থেকে চার গাড়ি লোক ধরে নিয়ে যায়। যাদের এখনো কোন খোঁজ নেই তারা আছে কিনা।

তিনি বলেন, মগ এবং মিলিটারিরা আমাদের মুসলমানদের বেশির ভাগ প্রভাবশালী, যুবক এবং যুবতি নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলছে। নারীদেরকে ধর্ষণ করছে এবং পুড়িয়ে দিচ্ছে। শুক্রবার জ্বালিয়ে দেওয়া আগুন শনিবার সকালেও শাহপরীর দ্বীপ থেকে কাদিচিল এলাকায় আগুনের কু-লী স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

মিয়ানমারে সেনাবাহিনী এবং মগদের নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এখনো দল বেঁধে টেকনাফ শাহপরীর দ্বিপ হয়ে উখিয়ায় প্রবেশ করছেন। সেনা সদস্য ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে নাফ নদী পার হচ্ছেন এসব রোহিঙ্গা।

সিমান্ত এলাকা নাফ নদী দিয়ে বারমার মন্ডু নোয়াপাড়া থেকে পালিয়ে আসা নূর কায়েস আশ্রয় নেন শাহপরীর দ্বিপের পাশেই। তিনি বলেন, বারমা সেনাবাহিনীর হাতে খুন হয়েছে স্বামী। তিনি বাঁচার জন্য নাফ নদী দিয়ে আসেন বাংলাদেশে। তবে এসেই হারান কোলের চার বছরের সন্তানকে।

কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, মিয়ানমারের বৌদ্ধ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা একযোগে মুসলিম এলাকাগুলোতে একের পর এক আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। পুড়িয়ে দিচ্ছে দোকানপাট এবং ঘরবাড়ী। তুলে নিয়ে হত্যা করছে যুবক এবং নারীদের। নারীদের ধর্ষণ করার পর পুড়িয়ে হত্যা করছে সেনা সদস্যরা। শুক্রবার রাতে জীবন নিয়ে নাফ নদীর সীমান্তে এসে গা ঢাকা দেন ৪৫বছরের এ মহিলা। পরে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দালালের মাধ্যমে ৬ হাজার টাকা দিয়ে নদী পার হয়ে শাহপরীর দ্বীপে এসেছেন তিনি।

এভাবেই প্রতিদিনই জীবনের বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে নাফ নদী পার হয়ে আসছেন হাজার হাজার মুসলামান আরাকান রোহিঙ্গা। ২-৩মাসের কোলের সন্তানদের নিয়ে বাঁচার আশায় টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় আশ্রয় নিচ্ছেন। কিভাবে থাকবেন, কোথায় থাকবে জানেন না এসকল পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

nine − 2 =