চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে চামড়ায় ধস’

0
1137

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গত ৩০ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম দামে কেনাবেচা হচ্ছে পশুর চামড়া। এজন্য মৌসুমি ব্যবসায়ী বা ফড়িয়ারা ট্যানারি মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের দিকে অভিযোগের তীর ছুঁড়লেও ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের কারণেই কাঁচা চামড়ার দাম পড়ে গেছে। এছাড়া, হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভারের ‘অপ্রস্তুত’ চামড়া-শিল্পনগরীতে স্থানান্তরিত করার কারণেও দেশি-বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলেও দাবি ব্যাবসায়ীদের।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ)-এর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও আনোয়ার ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলজাহান ভূঁইয়া বলেন, ‘চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের দেশের চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। এবার কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দামও একারণে পড়ে গেছে।’ এখন ইচ্ছে করলেও চামড়া ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে পারবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

দিলজাহান ভূঁইয়ার মতো একই ধরনের মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধান বাজার হলো চীন। অথচ গত তিন মাস ধরে চীনে রফতানি হচ্ছে না। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন আমাদের চামড়া নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আগের অর্ডার-তো নিচ্ছেই না, নতুন কোনও অর্ডারও দিচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগের অর্ডার দেওয়া প্যাকিং করা প্রায় ১০০ কন্টেইনার এখনও নিচ্ছে না চীন।’

এদিকে ফড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর আগে কখনও এত কম দামে চামড়া কিনতে পারেননি তারা। আড়তদার এমনকি ট্যানারি মালিকরাও বলছেন, গত তিন দশকে চামড়ার দাম এত কমেনি।

ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘চামড়ার দাম এত কম এর আগে কখনও হয়নি। বিগত তিন দশক পর এবার চামড়ার দাম সবচেয়ে কম।’

রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, এবার ফড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা গড়ে পাঁচশ’ টাকায় চামড়া কিনেছেন। আর রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য স্থানে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে গড়ে চারশ’ টাকায়।

জানা যায়, কাঁচা চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই ফড়িয়াদের কাছে চামড়া বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে রেখেছেন। এ নিয়ে ফেসবুকে পোস্টও দিয়েছেন কেউ কেউ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল মোজাম্মেল হক চৌধুরী তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘৮২ হাজার টাকা দামের মহিষের চামড়া ৬০ টাকায় বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে রাখলাম। ভালো করলাম না মন্দ করলাম।’

পাবনার ভাঙ্গুড়ার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন বলেন, ‘৩০ বছর আগে ১৯৮৯ সালে কোরবানির ঈদে পশুর মালিকরা সাতশ’ টাকায় চামড়া বেচেছেন। এবার সেই মানের চামড়া কেনা সম্ভব হয়েছে পাঁচশ’ টাকারও কম দামে।’

চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ ছাড়াও চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ার জন্য আরও চারটি কারণ উল্লেখ করেছেন বিএফএলএলএফইএ-এর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দিলজাহান ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ার জন্য চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ প্রথম কারণ হলেও দ্বিতীয়ত কারণ হলো— সাভারের চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ, সাভারের চামড়া শিল্পনগরী এখনও নদীর মতো হয়ে আছে। সেখানে কাদা আর পানি দেখে বিদেশি ক্রেতারা চলে গেছেন। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) প্রস্তুত হয়নি। চতুর্থত, চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের এখন আর্থিক সংকট রয়েছে।

চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ ছাড়াও চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ার জন্য আর্ন্তজাতিক বাজারে মন্দা অবস্থাকেও দায়ী করেছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আর্ন্তজাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের বিকল্প পণ্যগুলোর চাহিদা এখন বেশি। এছাড়া, সব ট্যানারি সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করার কারণে চামড়ার দাম পড়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গতবছর সাভারে সব ট্যানারি নিয়ে যাওয়ার ফলে পুরনো অনেক ক্রেতা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। নতুন ক্রেতাও আসছে না।’

এদিকে ট্যানারির মালিকরা বলছেন, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করার কারণে প্রায় ২২৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু কারখানা পরে চালু হলেও ছোট-বড় দেড় শতাধিক ট্যানারি এখনও বন্ধ রয়েছে। একই অবস্থা চট্টগ্রামেও। বন্দরনগরীতে একসময় ২২টি ট্যানারি থাকলেও ২১টিই একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু আছে মাত্র একটি, যার প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা ওই অঞ্চলে সংগৃহীত মোট চামড়ার ২০ শতাংশেরও কম। চামড়া প্রক্রিয়াকরণ নয়। চালু করা যায়নি স্থানান্তরিত সব ট্যানারি। খালি নেই চামড়া শিল্পনগরীর ডাম্পিং ইয়ার্ডও। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) প্রস্তুত হয়নি, চামড়া কাটার পর বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে, নির্ধারণ হয়নি সেটিও। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি আছে বর্তমানে ১৫৫টি, এর মধ্যে ১১৫টি উৎপাদনে সক্ষম।

রফতানিতে অবদান রাখা দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই খাতকে ২০১৭ সালে ‘বর্ষ-পণ্য’ ঘোষণা করা হলেও রফতানি পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রফতানি আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ কম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয় হয়েছে ১২৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

10 − seven =