“পন্ডিত মহাশয় ” আবুল কালাম আজাদ

0
752

আমাদের পন্ডিত মহাশয়ের বাড়ি আমার গ্রামেই। তার নাম সোনা উল্লাহ পণ্ডিত। আমাদের স্কুলে সাধারণত তিনি প্রথম শ্রেণিতে বর্ণমালা লেখা শেখাতেন এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজী এবং মাঝে মাঝে অংকও নিতেন। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াতেন বাংলা ব্যাকরণ। আজও আমার মনে পড়ে যে সুর ও,ধ্বনিতে ব্যাকরণের শব্দগুলো তিনি উচ্চারণ করতেন।যেমনঃঅব্যয় এবং,কাজে কাজেই,সুতরাং,যদি,যদ্যপি ইত্যাদি শব্দগুলোর কম্পন ও সুর এখনো আমার মস্তিকে অবিকল ভাবে তেমনি আছে।আরো তিনি শেখাতেন অংক।
“মাস মাইনা যার যত
দিন তার পরে তত
টাকা প্রতি দশ গণ্ডা,
দুই কড়া দুই ক্রান্তি”।
শিখেছিলাম বটে এসব অংক।কিন্তু আজ কড়াক্রান্তি ধূলের হিসাব অস্তাচলে মিলিয়ে গেছে।ঐ চিহ্নগুলো এখন সামনে ধরলেও বলতে পারবো না কোনটা কড়া,কোনটা গণ্ডা,কোনটা ক্রান্তি। বর্তমান কালের ছেলেমেয়েদের ভাগ্য ভালো, যে কড়া, গণ্ডা, ক্রান্তির হিসাব এখন আর করতে হয় না। আরো ভালো যে, কারো মাসিক বেতন মাত্র এক টাকা, এটাও শুনতে হয় না।
আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় আমার পন্ডিত মহাশয়ের বাড়ি ছিল। তিনি ছিলোনা একজন মেধাবী ছাত্র। শাহ্ মোবারক মেমোরিয়াল মাইনর স্কুলে পরেছেন। মাইনর অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর জেলা শহর থেকে শুরু ট্রেনিং পাশ করার পর পন্ডিত হিসেবে নিয়োগ পান গবরা কাশিমপুর ফ্রী প্রাইমারি স্কুলে।
এই স্কুলটির নাম গবরা কাশিমপুর কেন হলো তার একটা ছোট ইতিহাস আছে। স্কুলটি প্রথমে যে জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় তা ছিল গবরা কুতুবপুর গ্রামে। স্কুলটির আশেপাশে জনবসতি কম ছিল। আমার বাবা পঞ্চায়েত প্রধান থাকার কারনে স্কুলটিতে বেশী ছাত্র না থাকায় স্কুলটি কাশিমপুর গ্রামে সরিয়ে নিয়ে আসেন। স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজন ছিলেন শ্রীযুক্ত বাবু ধনেশ্বর মণ্ডল। বাবু ধনেশ্বর মণ্ডলের আড়াইশ বিঘা জমি ছিল। আমাদের এলাকায় তিনি ছিলেন বিশিষ্ট ধনী লোক। ধনেশ্বর মণ্ডল পঞ্চায়েতের একজন প্রভাবশালী সদস্যও ছিলেন। তিনি একবার বাবাকে অনুরোধ করেন যেহেতু স্কুলটি গবরা কুতুবপুরে স্থাপিত হয়েছিল,সেজন্য গবরা শব্দটি সামনে রেখে গবরা কাশিমপুর ফ্রি প্রাইমারি স্কুল রাখা হোক।
হাঁ আমি ঐ স্কুলেরই ছাত্র। তবে আমার স্কুলের নাম গবরা কাশিমপুর হওয়াতে এখনো বাইরের লোক তাচ্ছিল্য করে বলে ওরা গবরার লোক। কেননা গবরার সাথে গরুর গোবরের একটা সংযোগের কথা মনে মনে আসে।যাক সে কথা, এবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।স্যারের কিন্তু বেশ কয়েক বিঘা চাষের জমি ছিল, একটা ফলের বাগান, একটা পুকুর এবং পাটকাপাড়া বিলেও তার নীচু জমি ছিল,সেখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো।আমার সারের এতকিছু থাকার পারেও আমি বা অন্য কেউ স্যারকে কোনদিন কৃষিকাজ করতে, মাছ ধরতে বা ফল পারতে এমনকি বাজার করতেও দেখিনি। স্যার দেখতে বেটে খাটো ছিলেন। সারা বৎসরই হাতে একটা ছাতা থাকতো এবং ছাতাটা সর্বদা মাথার উপর মেলানো থাকতো। স্যার কোন সময়ই ডানে বামে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেন না।তার দৃষ্টি থাকতো সব সময় সামনের দিকে। খুব ধীর পায়ে হাঁটাচলা করতেন।ব্যক্তিত্ব ও গাম্ভীর্যে তিনি ছলেন হিমালয় পর্বতসম।এরকম গাম্ভীর্যের লোক এখন আমার চোখে খুব কম পড়ে।স্যার রাস্তায় খুব ধীরে ধীরে হাঁটতেন।বিপত্তি ঘটতো তার পিছনে যারা হাঁটতো তাদের,কারণ ওনাকে ছাড়িয়ে কেউ সামনে যেত না।আমরা ছেলেরা জোরে হেঁটে তাকে সামনে দেখতেই দৌড় দিয়ে অন্যদিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম,যাতে ওনার নজরে না পড়ি।কথা বলতেন পরিষ্কার সাধু ভাষায়। কখনো কখনো আমার কথা বলার সময় চলতি ভাষা মিশে গেলেই বলতেন, `আসলে তোমরা মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া কর না।তা না হইলে কথা বলিতে ভাষায় এত ভুল হইবে কেন।`
আমরা গাঁও-গ্রামের ছেলে ভাষা নিয়ে কখনোই সচেতন ছিলাম না।সচেতন হওয়ার জন্য স্যার ছাড়া আমাদেরকে কেউ কখনো তাগিদ দেয়নি।আমরা পাড়ায় পঞ্চাশ পরিবারের ছেলে মেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতাম স্থানীয় ভাষায় ও সাধু চলতি মিশিয়ে। সাধু ও চলতি ভাষার মিশ্রণ নিয়ে কখোনই সজাগ ছিলাম না।সজাগ থাকার প্রশ্নই উঠেনা।মাঝে মধ্যেই দেখতাম স্যার আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে তার মেয়ের বাড়ি যেতেন।পেছনে থাকতো কাজের ছেলে, আর কাজের ছেলের মাথার ঝুড়িতে থাকতো কখনো ফল ফলারি,কখনো খই,মুড়ি,চিড়া,গুড়,কখনো পিঠা-পায়েশ।এ সকল নিয়ে তিনি মেয়ের বাড়ি যেতেন।যেহেতু আমরা একই গ্রামের এবং একই পাড়ার বাসিন্দা দেখা হলেই জিজ্ঞেস করতেন কেমন আছি,কোনো শ্রেণীতে পড়ি।স্যারের প্রতি আমাদের শেষ কথা থাকতো স্যার দোয়া করবেন।স্যারও উত্তর দিতেন আচ্ছা।
আমি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর স্যারের সাথে আমার খুবই কম দেখা সাক্ষাত হতো।মুক্তিযুদ্ধের পর আমি পীরগন্জ সদরে অবস্থান করা শুরু করি।ফলে স্যারের সাথে আর দেখাই হতো না।মাঝে মধ্যে মনে হলেই আমি আমার বড় ভাইয়ের মাধ্যমে খোঁজ খবর নিতাম। ১৯৭৬ সালে একদিন আমি বিকেল বেলায় পীরগন্জ হতে রওনা দিয়ে মাদারগঞ্জে কিছু দরকারী কাজকর্ম শেষ করে সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে বাড়ির কাছাকাছি একটি জঙ্গলের মাঝ দিয়ে যখন আসছি তখন সামনেই দেখলাম স্যার ছাতা মাথায় হেঁটে চলছেন।তখন গোধূলি বেলা।স্যারকে দেখেই সাইকেল থেকে নেমে সালাম দিলাম”আসসালামু আলাইকুম “।স্যার উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কে বাবা?উত্তরে আমি আমার পরিচয় দিয়ে অবনত মস্তকে শ্রদ্ধার সাথে পাশে দাঁড়ালাম।আমাকে স্যার অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন। আমি এখন কি করি,কোথায় থাকি,মুক্তিযুদ্ধের পর অবস্থা কি? আমি সবিস্তারে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেসা করলাম,’স্যার আপনি কেমন আছেন?’ উত্তরে বললেন, ‘চোখে এখন কম দেখি,শরীরটাও দুর্বল,হাঁটাচলা তেমন ভালো লাগে না’।আমি তখন বললাম, ‘স্যার আপনার জন্য আমি এক বোতল ভিটামিন ঔষধ দিবো’।স্যার আমার মাথায় হাত দিয়ে খুব খুশি হয়ে ‘বেঁচে থাকো বাবা’ বলে দোয়া করলেন।কিন্তু ঐ ভিটামিনের বোতল আর কখনো আমি স্যারকে দিতে পারিনি।
আমাদের পারিবারিক একটি ঔষধের দোকান ছিল। আমি মনে করেছিলাম স্যারকে একটি বড় বোতলের ভিটামিন ঔষধ দেবো।কিন্তু সে রকম বড় বোতল আমাদের দোকানে ছিল না। কয়েক সপ্তাহ পর পাশের ময়নার দোকানে গিয়ে একটি ভিটামিনের বড় বোতল নিয়ে বড় ভাইয়ের হাতে দিয়ে স্যারের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা বলতেই বড় ভাই বললেন, ” পণ্ডিত স্যার গতকাল মারা গেছেন এবং দাফনও হয়ে গেছে”।আমি সাথে সাথে স্তব্ধ এবং র্নিবাক হয়ে গেলাম।আমি স্যারকে সামান্য এক বোতল ভিটামিন ঔষধ দেয়ার ওয়াদা করেছিলাম। কিন্তু ওয়াদা মোতাবেক ঔষধ আর কখনো আমি স্যারকে দিতে পারবোনা। ওয়াদাভঙ্গের ঐ কষ্ট ও যন্ত্রনা আমার মধ্যে তাৎক্ষণিক একটা অপরাধবোধের জন্ম দিয়েছিল।’আজও তা’ আমি ভুলতে পারি নি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 × five =