প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রতিবেদন সংসদে

0
1253

ঢাকা অফিসঃ
সংসদে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্তত আটটি ধারায় গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের আপত্তি থাকলেও তা সুরাহা না করে সংসদে রিপোর্ট উপস্থাপন করেছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তবে গণমাধ্যমের আপত্তির ক্ষেত্রে কয়েকটি ধারায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। এক্ষেত্রে এই আইনের অধীনে অপরাধের কিছু জায়গায় শাস্তি কমানোরও সুপারিশ করা হয়েছে।

সোমবার সন্ধ্যায় সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ বিলের প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন। এই বিলে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ এনে বিল উত্থাপনকালে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ বলেন, গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের বক্তব্য সন্নিবেশ করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়েছে। এই বিলটি পাস হলে তা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় ভূমিকা রাখবে। এদিকে সংসদে রিপোর্ট উপস্থাপনের আগেই রিপোর্টের সুপারিশগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সম্পাদক পরিষদ গতকাল রবিবার এক বিবৃতি দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

গত ২৯ জানুয়ারি ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। বহুল আলোচিত এই আইনের খসড়া আইনসভার অনুমোদনের জন্য গত ৯ এপ্রিল সংসদে উত্থাপন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। এই বিলটি চলতি অধিবেশনে পাস হবে বলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন। চলতি অধিবেশন ২০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই অধিবেশন ছাড়া অক্টোবর মাসে দশম সংসদের আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। সেই বৈঠকটি হবে নির্বাচনের আগে শেষ অধিবেশন।

আইনটি মন্ত্রিসভায় ওঠার পর থেকেই এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এই আইনের ফলে ‘স্বাধীন’ সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে। খসড়া আইনটি সংসদে তোলার পর তা পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। সংসদীয় কমিটিকে প্রথমে চার সপ্তাহের সময় দেওয়া হলেও পরে দুই দফায় তিন মাস সময় বাড়িয়ে নেয় কমিটি।

তবে শেষ দফায় এক মাস সময় নিলেও একদিনের মধ্যে বৈঠক করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে সংসদীয় কমিটি। প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে দুই দফায় সম্পাদক পরিষদ, টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠক করে সংসদীয় কমিটি।স সংসদীয় কমিটিতে সম্পাদক পরিষদ খসড়া আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ধারার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপত্তি জানায়।

প্রস্তাবিত আইনের ৮ ধারায় ছিল, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করলে ওই তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতে ব্লক করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি অনুরোধ করতে পারবে।

ওই ধারায় আরও বলা হয়েছে, যদি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে মনে হয় যে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য দেশের বা দেশের কোনও অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে তাহলে বাহিনী ওই তথ্য-উপাত্ত অপসারণ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মাধ্যমে বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে।

এই ধারায় পরিবর্তনের জন্য সম্পাদক পরিষদ সংসদীয় কমিটিতে প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে এখানে কোনও পরিবর্তন আনেনি কমিটি। সংসদীয় কমিটির সুপারিশে এই বিলে প্রয়োগ সংক্রান্ত বিধানে শর্ত যুক্ত করে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে তথ্য অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর বিধানবলী কার্যকর থাকবে।’

সংসদে উত্থাপিত বিলে ১৮ ধারায় কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার সিস্টেমে বেআইনি প্রবেশে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড এবং তিন লাখ টাকার বিধান ছিল। সংসদীয় কমিটি এখানে শাস্তি কমিয়ে ছয় মাস কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা দণ্ডের বিধান রেখেছে।

বিলের ২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে প্রচারণা বা প্রপাগান্ডার দণ্ডের বিধানের অংশে সংসদীয় কমিটি ‘জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকা’যুক্ত করার সুপারিশ করেছে। এখানে শাস্তি কমানোরও সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এখানে আগে ১৪ বছরের জেল বা এক কোটি টাকা কিংবা উভয়দণ্ডের বিধান ছিল। সংসদীয় কমিটি ১০ বছরের কারাদণ্ড করার সুপারিশ করেছে।

২৫ ধারায় বলা ছিল, যদি কোনও ব্যক্তি ইচ্ছা করে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করে যা আক্রমণাত্মক, ভীতি প্রদর্শন বা কাউকে নীতিভ্রষ্ট করে বা বিরক্ত করে; অপমান, অপদস্ত বা হেয় করে; রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করতে বা বিভ্রান্ত করতে কোনও তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত করে প্রকাশ বা প্রচার করে তবে তা অপরাধ হবে।

এই ধারার চারটি উপধারাকে ছোট করে দুটি উপধারা করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। তবে মূল বক্তব্য প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২৮ ধারায় ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার বিধানে শাস্তি কমানোর সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। সদে উত্থাপিত বিলে সাত বছরের জেল বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান ছিল। সংসদীয় কমিটি জেল কমিয়ে ৫ বছর করার সুপারিশ করেছে।

মানহানিকর তথ্য প্রচার নিয়ে ২৯ ধারায় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে আপত্তি করা হলেও সেখানে কোনও পরিবর্তন আনেনি সংসদীয় কমিটি। বিলে ৩১ ধারায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে এমন তথ্য প্রচারের বিষয়ে পরিবর্তন করার দাবি জানায় সম্পাদক পরিষদ। এক্ষেত্রেও সংসদীয় কমিটি কোনও পরিবর্তন আনেনি।

সংসদে উত্থাপিত বিলের ৩২ ধারা নিয়ে সাংবাদিক মহলের সবচেয়ে বেশি আপত্তি ছিল। ওই ধারায় সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনও ধরনের তথ্য-উপাত্ত, যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে এবং এ অপরাধে ১৪ বছর কারাদণ্ড ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডর বিধান রাখা হয়েছে।

এখানে সংসদীয় কমিটি পরিবর্তন করার সুপারিশ করেছে। কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনও ব্যক্তি ‘দাফতরিক গোপনীয়তা আইন-১৯২৩ এর আওতাভুক্ত কোনও অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত করে বা করতে সহায়তা করে তাহলে তিনি সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সংসদে উত্থাপিত বিলে এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের জন্য বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সংসদীয় কমিটি এখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালকের অনুমোদন সাপেক্ষে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের বিধান রাখার সুপারিশ করেছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

14 + 16 =