বজ্রপাতে এক-চতুর্থাংশ মারা যায় বাংলাদেশে

0
1465

বজ্রপাতে বিশ্বে যত মানুষ মারা যায়, তার এক-চতুর্থাংশ মারা যায় বাংলাদেশে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাত বৃদ্ধি পায় সাড়ে ১২ শতাংশ। নাসার কারিগরি সহায়তায় উপগ্রহের সাহায্যে একটি গবেষণা চালিয়েছেন টেক্সাসের এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। তারা জানান, বজ্রপাতের পর পরই ট্রপসফিয়ারে (বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তর) প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন অক্সাইড (নাইট্রিক অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড) তৈরি হয়। বিষাক্ত এ গ্যাস বাতাসের এমন একটি স্তরে জমে থাকছে, যার ফলে দূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিপাতের তীব্রতা ও মেঘের পরিমাপের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ শতাব্দীর শেষে বজ্রপাতের পরিমাণ আরো ৫০ ভাগ বাড়বে। যানবাহনের কারণে দূষণ বা শিল্পদূষণের চেয়ে বজ্রপাতজনিত দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। বজ্রপাত যেমন বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে, তেমনি আবার দূষণের ফলে বাড়ছে বজ্রপাতের হার। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত বজ্রপাতের বার্ষিক ও মাসিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোটামুটিভাবে সারা বছরই কমবেশি বজ্রপাত হলেও মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অধিক হারে বজ্রপাত হয়। বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনায় মোট ১২টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা উল্লেখ থাকলেও জীবনসংহারী বজ্রপাতের কথা ১৭ মে ২০১৬-এর আগে ছিল না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাতের বিপর্যস্ততায় প্রাকৃতিক এ আপদটিকে এদিন ‘দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করে।

সমসাময়িককালের পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বজ্রপাত বেড়ে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অব্যাহতভাবে বড় বড় বৃক্ষ নিধনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত গাছ লাগানো হচ্ছে না। তাই ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াসহ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। ওজোন স্তর ফুটো হয়ে যাওয়াসহ নানা উপায়ে বাতাসে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের অংশ বেড়ে উঠছে। বৃক্ষ নিধন, জলাভূমি ভরাট, নদী শুকিয়ে যাওয়া, কল-কারখানা ও মোটরগাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সেলফোন ও বৈদ্যুতিক টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিকাজে ভারী যন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি বজ্রপাত বৃদ্ধির প্রাথমিক সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। আবার আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রমে দেশের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা মে মাসে প্রায় ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি বেড়ে যাওয়ায় বর্ষা আসার আগেই জলীয় বাষ্প বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আর্দ্র ও উষ্ণ বায়ু বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তরে অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রায় একই সময়ে শুষ্ক ও ঠাণ্ডা বায়ু হিমালয় থেকে দক্ষিণে অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত হচ্ছে। উপর্যুক্ত প্রতিটি নিয়ামকই দেশে বজ্রঝড় সৃষ্টির আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। উদ্ভূত অবস্থার প্রেক্ষাপটে এ ভয়ঙ্কর ও প্রাণসংহারী দুর্যোগের হাত থেকে মানুষকে রক্ষায় সচেতন করার কোনো বিকল্প আপাতত নেই। এ প্রচেষ্টায় বজ্রঝড়ের সময় বাড়ির ভেতরে অবস্থান করা, উঁচু ভবনে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা করা, বসতবাড়ির চারপাশে উঁচু গাছ লাগানোসহ প্রচুর বৃক্ষরোপণ, কৃষিতে ভারী যন্ত্রাংশ ও কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত রাখা, তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক গ্যাসের নিঃসরণ কমানো, জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজন বিস্তর ও জ্ঞানগর্ভ গবেষণার।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 × four =