বিচার হতো মতিনের আদালতে প্রতি রাতেই

0
2002

বগুড়া প্রতিনিধিঃ বগুড়ার গডফাদার আবদুুল মতিন সরকার। জিরো থেকে হিরো হওয়ার গল্প পুরো বগুড়াবাসীর চোখের সামনে স্পষ্ট। মাদক ব্যবসা এবং পরিবহন চাঁদাবাজির সঙ্গে সমান তালে চলতো তার নৈশ আদালত। নিজেই বিচার করতেন। তার রায়ই চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নিতে হতো। কারো কোনো কথা বলার সাহস হতো না। বিচারিক এই খাত থেকেও কোটি কোটি টাকা কামাতো মতিন সরকার। যে পার্টি টাকার অংক বেশি দিতো তার পক্ষেই কাজ করতো মতিন সরকার। তার পালিত শতাধিক সদস্য জেলাব্যাপী দাপিয়ে বেড়াতো।
মতিন যেভাবে মতিন সাহেব: মতিন সরকারের বাবা মজিবর সরকার। মাত্র কয়েক বছর আগেই বগুড়া শহরের অলিগলিতে রিকশা চালাতেন। আয়ের একমাত্র উৎস ছিলো রিকশায় প্যাডেল মেরেই। মজিবর সরকারের সংসারে সদস্য সংখ্যা ছিলো বেশি। অনেক কষ্টে পার হয়েছে দিনকাল। ২০১০ সালেও চকসূত্রাপুর চামড়াগুদাম লেনে মতিন সরকারের ছোট্ট একটি মাটির ঘর ছিলো। সেই মাটির ঘরের মেঝেতেই তিনি রাত যাপন করতেন। সেই ঘর থেকেই তার মাদক ব্যবসা শুরু। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে আলিশান বাড়ি। সেই বাড়ির এসি রুমে তিনি আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই যুগ আগে মতিন ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসা করতো। এক সময় মতিন যুবলীগে নাম লেখায়। এরপর থেকেই মতিন যুবলীগ ক্যাডার হিসেবে শহরে পরিচিতি লাভ করে। যুবলীগ ক্যাডার হিসেবে একাধিক খুনের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে পড়ে। নাইন এমএম পিস্তলসহ পুলিশের হাতে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয় মতিন। সর্বশেষ ২০১২ সালে র‌্যাব মতিনের আস্তানায় তল্লাশি করে মাদকসহ গ্রেপ্তার করে। ওই ঘটনায় যুবলীগ র‌্যাব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শহরে আন্দোলন করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর মতিন কৌশল পাল্টিয়ে চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্রাক মালিক সমিতির পদ বাগিয়ে নেয়। আর এই দুই পদের কারণে জেলা প্রশাসন পুলিশ প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে গড়ে তোলে সখ্য। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এলাকায় জায়গা জমি দখল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে মতিন। তার প্রভাব লোক মুখে ছড়িয়ে পড়ায় বগুড়া শহর নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জমি জমার বিচার নিয়ে লোকজন আসতো মতিনের আস্তানায়। প্রতিদিন বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চকসূত্রাপুরে তার আস্তানায় বিচার কাজ চলতো। পাশাপাশি মদ ও জুয়ার আসর ও বসতো সেখানে। মতিনের বিরুদ্ধে এখনও রয়েছে একাধিক হত্যা মামলা। সন্ত্রাসী মতিন বগুড়া শহরে নাইন এমএম মতিন ওরফে কসাই মতিন ওরফে পিস্তল মতিন হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থেকে মতিন গত কয়েক বছরের মধ্যে বাগিয়ে নিয়েছে জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদ। ফলে মতিন এখন প্রশাসনে মতিন সাহেব হিসেবে পরিচিত।
মতিন এক সময় যুবলীগের সাধারণ কর্মী ছিলেন। পরে তিনি অস্ত্রধারী ক্যাডার বনে যান। ২০০০ সালের দিকে শহরের নূরানী মোড় এলাকায় সদর ফাঁড়ির টিএসআই তাকে গুলিভর্তি একটি নাইন এমএম পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করে। ২০০৪ সালের দিকে ওই মামলায় তার ২৭ বছর কারাদণ্ড হয়। কিছুদিন জেলে থাকার পর উচ্চ আদালতে মামলাটি স্থগিত হলে তিনি বেরিয়ে আসেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মতিন রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এরপর তিনি সংগঠনকে ব্যবহার করে মাদক, চাঁদাবাজি, জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। জায়গা দখলেও তার জুড়ি নেই। এভাবে খুব অল্প সময়ে কোটিপতি হয়ে যান। বর্তমানে তিনি বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করেন। বগুড়া ও ঢাকায় রয়েছে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট।
মতিন যেসব চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামি: আদালত ও পুলিশের তথ্য অনুসারে মতিনের নামে ১৯৯৮ সালে বগুড়া শহরের নূরানী মোড় এলাকায় রসুল, ২০০১ সালে চকসূত্রাপুরে আবু নাসের উজ্জ্বল, ২০১১ সালে মাটিডালি এলাকায় বাণিজ্যমেলা চলাকালীন শফিক চৌধুরী এবং ২০১৫ সালে চকসূত্রাপুরে আলোচিত এমরান হত্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে মতিন আটবছর ধরে পলাতক। একটি খুনের মামলায় তার বিরুদ্ধে ২০ বারের বেশি পরোয়ানা জারি হয়েছে। পলাতক হিসেবে তার নাম-ঠিকানা দিয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছেন আদালত। মালামাল ক্রোকের পরোয়ানাও জারি হয়। শেষ পর্যন্ত তার ‘অনুপস্থিতিতে’ই মামলার বিচার চলছে। অথচ তিনি কখনোই পলাতক ছিলেন না। বগুড়া শহর এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়েও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করে আসছেন। এসব অনুষ্ঠানে তার পাশে বসে থাকতে দেখা গেছে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাকেও। মতিন সরকার বগুড়ায় আগত একাধিক মন্ত্রীকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনাও জানিয়েছেন। এরপরও পুলিশ দফায় দফায় আদালতে তাকে পালতক দেখিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে। আদালতে পুলিশ এসব প্রতিবেদনে বলেছে, আসামি পলাতক বিধায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
মতিন সরকার বর্তমানে নয়টি মামলার আটটিতে জামিনে আছেন। শুধু আবু নাছের ওরফে মুন্সী উজ্জ্বল হত্যা মামলায় তাকে আট বছর ধরে ‘পলাতক’ দেখানো হচ্ছে। ওই হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে মতিন সরকার ও নিহত উজ্জ্বল দু’জনই অবৈধ কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব নিয়ে বিরোধের কারণেই উজ্জ্বলকে খুন করা হয়। এ মামলায় মতিন ও শফিকুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে। ওই মামলার আরেক আসামি আবু তালহা ওরফে ঠাণ্ডু ২০০২ সালের ২০শে জানুয়ারি খুন হন। তাকে খুন করে মতিনের সহযোগী। এ মামলার আরেক আসামি শফিকুল। আবু তালহা খুনের মামলায় শফিকুলের যাবজ্জীবন সাজা হয়। সেই থেকে তিনি জেলে আছেন।
প্রতিরাতেই বিচার হতো মতিনের আদালতে: শহরের বিভিন্ন জায়গার সাধারণ মানুষের যে কোনো সমস্যার বিচার করতেন মতিন। এর মধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত, মারামারি, চুরি, ছিনতাই, নারীঘটিত ঘটনা। তিনি এক পক্ষের নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে তার পক্ষেই রায় দিয়ে দিতেন। শহরের একাধিক ব্যক্তি তার অবিচারের শিকার হয়েছেন এমন নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জোর করেই তার সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করা হয় মতিনের বিচারে। তার করা বিচারের বিরুদ্ধে কখনোই কেউ কথা বলেতে পারতো না। প্রতিবাদ করলে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি শহর ছাড়ার করে দেয়ার ঘটনাও আছে।
যেভাবে ফেঁসে গেলেন মতিন: গত ১৭ই জুলাই তার ছোটভাই শহর শ্রমিক লীগের বহিষ্কৃৃত সভাপতি তুফান সরকার কলেজে ভর্তি করে দেয়ার কথা বলে কিশোরীকে বাসায় ডেকে নেয়। এরপর দিনভর তাকে আটকে রেখে কয়েক দফা ধর্ষণ করে। এতে ওই কিশোরী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পাশাপাশি বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হয়। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনাটি ওই কিশোরীর মা জানতে পারে এবং বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে তুফান সরকারের স্ত্রীর কানে যায়। এরপর শুক্রবার বিকালে তুফান সরকারের স্ত্রী আশা খাতুন তার বড় বোন পৌরসভার সংরক্ষিত আসনের নারী কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকি এবং তার মা রুমী বেগম ওই ধর্ষিতা এবং তার মায়ের উপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। পরে তাদের দুইজনের মাথা ন্যাড়া করে দেয়। এই ঘটনা প্রথমে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে জানাজানি হলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শহরব্যাপী। ওই ঘটনায় তুফানকে সন্ত্রাসী হিসেবে গড়ে তোলার তীর তার দিকে আসতে থাকে। গণমাধ্যমে তার সম্পর্কে এসব বিষয় নিয়ে লেখালেখি হয়। ফলে গত ঙ্গলবার দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তাকে বহিষ্কার করা হয়। মতিনকে বর্তমানে পুলিশ খুঁজছে। তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, মতিন সরকার আদালতের মাধ্যমে গত আট বছর ৩৫ বার সময় চেয়েছেন। তিনি অনেকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন আবার জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট থাকলে পুলিশ অবশ্যই গ্রেপ্তার করতো। তিনি জানান, সাম্প্রতি একটি মামলায় গত জুন মাসের ১ তারিখে আদালত থেকে ওয়ারেন্ট ইস্যু হলেও তার কপি এখনো থানায় পৌঁছেনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

3 × 2 =