ভোটের আগে শিক্ষকদের জন্য যত ‘নির্বাচনী উপহার’

0
1214

ঢাকা অফিসঃ
নির্বাচনের আগেই সারাদেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকরা পেলেন বেশ কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা। নির্বাচনী তফসিল জারির আগেই শিক্ষা প্রশাসনেও বড় ধরনের পদোন্নতি, পদোন্নয়ন, পদায়ন, নিয়োগ ও বকেয়া বেতন ছাড়ের ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে বড় ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচনের আগেই এসব নিয়োগ ও পদোন্নতির কাজ শেষ হয়েছে। ক্যাডার থেকে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী পর্যন্ত এসব নিয়োগ ও পদোন্নতি হয়েছে। এর বাইরেও বেসরকারি শিক্ষকরা তাদের বড় দুটি দাবি নির্বাচনের আগেই পূরণ করিয়ে নিতে পেরেছেন। এমপিওভুক্ত পৌনে পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর বৈশাখী ভাতা ও ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের দাবি পূরণ হয়েছে। তারা দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করে আসছিলেন। গত ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টসহ বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য মোট এক হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পর অপেক্ষমাণ যত পদোন্নতি ও নিয়োগ রয়েছে, সব নির্বাচনের তফসিল জারির আগেই শেষ করা হয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারে সহযোগী অধ্যাপক থেকে রেকর্ড সংখ্যক ৪০৯ জনকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। পদ না থাকার পরও তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। একইভাবে ২৪ অক্টোবর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ৫৭৪ সহকারী অধ্যাপককে পদোন্নতি দিয়ে সহযোগী অধ্যাপক করা হয়েছে।

প্রভাষকদেরও পদোন্নতি : সহকারী অধ্যাপক হিসেবে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত ৬৩৪ জন গত ৩১ অক্টোবর পদোন্নতি পেয়েছেন। সর্বোচ্চ সংখ্যক পদোন্নতি দেওয়ায় শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা নতুন সংগঠন `স্বাধীনতা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সংসদ`-এর নেতারা। সংসদের সদস্য সচিব সৈয়দ জাফর আলী বলেন, সর্বাধিক সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় তাদের প্রতি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা।

স্কুল শিক্ষকদেরও পদোন্নতি : নির্বাচনের আগে সরকারি বিদ্যালয় থেকে বেসরকারি বিদ্যালয়- সব পর্যায়ে নিয়োগ দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। এরই মধ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪২০ শিক্ষককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৭১ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকা এবং ৫২ জন সহকারী মাধ্যমিক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। নিয়োগের ২৭ বছর পর পদোন্নতি পেলেন তারা। এই পদোন্নতির মধ্য দিয়ে ওই শিক্ষকরা নবম গ্রেডে, অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদায় উন্নীত হলেন। আর সারাদেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এক হাজার ৩৭৮ জন শিক্ষক। প্রথমবারের মতো পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অধীনে এ নিয়োগ দেওয়ার জন্য গত ৯ সেপ্টেম্বর পিএসসি এ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। শিগগিরই পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করবে পিএসসি। তারা সরকারি চাকরিতে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার পদমর্যাদায় নিয়োগ পাবেন।

এ ছাড়া পদোন্নতির তালিকায় আছেন শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকরা। তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করার প্রস্তাবে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি মিলেছে। এর ফলে শিক্ষকরা দশম গ্রেডে বেতন পাবেন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ (টিটিসি), সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ সারাদেশে ৩২৭টি পুরনো সরকারি কলেজসহ সদ্য সরকারি হওয়া ২৯০টি সরকারি কলেজে শারীরিক শিক্ষকদের পদ ৬০৭টি। দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদায় উন্নীত হলে এবং নতুন সরকারি কলেজে পদ সৃজন হলে সেসব কলেজের শিক্ষকরাও সমমর্যাদা পাবেন।

অবশ্য এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে পদোন্নতি ও নিয়োগ বন্ধ ছিল। এই জট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখানে নির্বাচন কোনো বিষয় নয়।

আসছে ৩৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার : সারাদেশে ৩৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে নভেম্বরে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য এ সুপারিশ করবে।

সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগে সারাদেশের সব বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শূন্য আসনের তালিকা পাঠাতে নির্দেশ দেয় এনটিআরসিএ। প্রথম দফায় সব শূন্য পদের তালিকা না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়ানো হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় মেধাতালিকা পাঠানোর সময় শেষ হয়।

প্রাথমিক শিক্ষকদের নির্বাচনী উপহার : বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো `সহকারী প্রধান শিক্ষক` পদ নেই। দেশের ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি করে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে ৬৫ হাজার সহকারী শিক্ষকের পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর বাইরে প্রধান শিক্ষকদের ঠিক এক ধাপ নিচে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সহকারী শিক্ষকরা যে আন্দোলন করে আসছিলেন, তা নির্বাচনের আগমুহূর্তে এসে `আংশিক` বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত মতে, সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের ঠিক পরের গ্রেড নয়; সহকারী প্রধান শিক্ষকের নিচের গ্রেডে বেতন পাবেন। এর মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের ঠিক পরের গ্রেডে বেতন না পেলেও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড এক ধাপ উন্নীত হচ্ছে।

সারাদেশে ৬৫ হাজারের কিছু বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চার লাখের কাছাকাছি প্রাথমিক শিক্ষক রয়েছেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার নিজেই শিক্ষকদের দাবি পূরণের মাধ্যমে বেতন স্কেল উন্নীতকরণকে `নির্বাচনী উপহার` বলেছেন। আগামী এক মাসের মধ্যেই শিক্ষকদের দাবি পূরণ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মন্ত্রী।

অন্যদিকে, সম্প্রতি সারাদেশের ১৫ হাজার সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে বসানো হয়েছে। এখন তাদের স্থায়ী করার কাজও শুরু করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে এই ১৫ হাজার শিক্ষক ভীষণ খুশি।

জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পেলেও বেতন পান একাদশ/দ্বাদশ গ্রেডে। দশম গ্রেডে তাদের বেতন পাওয়ার কথা। আর সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৪/১৫তম গ্রেডে। সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের পরের গ্রেডে বেতন চান; একাদশ/দ্বাদশ গ্রেডে। এ নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন হলেও সরকার খুব একটা আমলে নেয়নি। কিন্তু নির্বাচন সামনে থাকায় শিক্ষকদের এসব দাবি আমলে নিয়ে কাজ শুরু করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মতে, প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে বেতন দিয়ে `সহকারী প্রধান শিক্ষক`-এর একটি পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাদের বেতন একাদশ অথবা দ্বাদশ গ্রেডে হতে পারে। সহকারী প্রধান শিক্ষকদের পরের গ্রেডে, অর্থাৎ ১৩ অথবা ১৪তম গ্রেডে সহকারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ হতে পারে। যদিও সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে, নাকি বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে যিনি সিনিয়র, তাকে এই পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে, তা এখনও নির্ধারণ হয়নি।

বেসরকারি শিক্ষক : বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারীদের অন্যতম বড় দাবিও সম্প্রতি পূরণ করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নিয়ে তাদের জন্য ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট এবং বৈশাখী ভাতার ঘোষণা এরই মধ্যে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই ইনক্রিমেন্টের জন্য বাড়তি ৫৩১ কোটি ৮২ লাখ ৩৯ হাজার টাকা লাগবে। আর বৈশাখী ভাতার জন্য লাগবে ১৭৭ কোটি ২৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা।

এ ব্যাপারে নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকারকে বলেন, তার মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। চলতি বছরের (২০১৮) জুলাই থেকেই শিক্ষকরা এসব সুবিধা পেতে শুরু করবেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

twenty + 17 =