মালয়েশিয়ার জেলখানায় অবরুদ্ধ এক মাস

0
1965

আন্তর্জাতিক রিপোর্টারঃ হাজত হচ্ছে পৃথিবীর ভেতর আরেকটি পৃথিবী। ‘জীবনে একবারের জন্য হলেও হাজতে যাওয়া উচিত’ এমন নীতিকথা হয়তো আমরা অনেকেই জানি, কিন্তু সেখানে অনেকেই কখনও যায়নি।

যারা অবরুদ্ধ কারাগার সম্পর্কে জানতে চান, তাদের জন্য আমার এক মাস হাজত বাসের অভিজ্ঞতা উৎসর্গ করলাম।

আজকের সর্বাধিক পঠিত টিপস্

আমি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ‘সোলারিশমন্ট কিয়ারা’ নামে একটা কোরিয়ান রেস্তোরাঁয় খণ্ডকালীন চাকরি করতাম। সেদিন আরবি শাওয়াল মাসে রোজা রাখার উদ্দেশ্যে সেহরি খেয়ে সকালে নামাজ পড়ে একটু ঘুমিয়েছিলাম। সকাল ৯টার দিকে ঘুম ভেঙে যায়, মাকে ইমোতে ভিডিও কল দিয়ে আনুমানিক এক ঘণ্টার বেশি কথা বলি।

কাপড়-চোপড় পরে কাজে যাওয়া জন্য তৈরি হয়েছি। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে গাড়ি আসল নিয়ে যেতে। কাজে যাওয়ার পর রেস্তোরাঁ খোলার পর তিন থেকে পাঁচ টেবিলে কাস্টোমার এসেছিলো। আমরা মোট কর্মচারী ছিলাম ১১ জন।

হঠৎ পেছন থেকে আমার চাচাত ভাই আব্দুল মালেক দৌড় দিলো। তখন আমি টেলিভিশনের সামনে ছিলাম। কী একটা কথা নিয়ে আমি আর রিদুওয়ান ভাই আলোচনা করছিলাম। পেছনে ফিরতে দেখি, আমার সামনে ইমিগ্রেশন পুলিশ অফিসার।

আমাকে থাপ্পড় দিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসার নিচে বসতে বললেন। আমি বসে পড়লাম। আমাকে এক হাতে কড়া লাগিয়ে আরেক হাত ধরে রাখলো। ঠিক পাঁচ মিনিট পরে বলল পাসপোর্ট দাও। আমি পাসপোর্ট দিলাম। সেটা দেখে বললেন, তোমার ছাত্র ভিসা, তাহলে কোম্পানি ইউনিফর্ম পরে কাজ করছো কেন?

প্রশ্ন করলেন ঠিকই, কিন্তু উত্তর দিয়ে লাভ হলো না। আমার কর্মস্থলের ম্যানেজার একজন কোরিয়ান মহিলা। উনি অনেক তর্ক করলেন যেন মালিক না আসার আগেকাউকে বের করে না নিয়ে যায়। অফিসার আমাদের বের করে নাই। আর একজন অফিসার এসে হাতকড়া খুলে দিয়ে বললেন, তোমাদের কাপড় আগের মতো করে পরে নাও। আমরা পরছিলাম না দেখে উনি চট করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।

আমরা ছিলাম চারজন- আমি আর সাদ্দাম চট্টগ্রামের ছেলে আর লিমন ও সোহেল ঢাকার ছেলে। অফিসার আ,আদের ভিডিও প্লাস ছবি তুললেন। পরে দেখি এগুলো সব রিপোর্ট আমাদের চারজনের ফাইলে প্রিন্ট করে যুক্ত করলেন।

মালয়েশিয়া জেলে এক মাস থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল মনে হলো আমার কাছে। মালেয়শিয়ার জেলে অবৈধ শ্রমিকের সাথে বহু বৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকও আমার মতো আটক রয়েছেন। জেলে আটক আছে ছাত্র ও পর্যটক ভিসায় আসা বহু শ্রমিক। বেশিরভাগই দালালকে টাকা দিয়ে পাসপোর্ট করেছিলো, আর এখন তারা জেলে। একেবারে কাগজ-পত্রবিহীন শ্রমিকরা দেশটির আইনানুসারে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুটি করে বেত্রাঘাত শাস্তি হিসেবে পাচ্ছে।

কুয়ালালামপুর জানাল দ্রোতার বন্দি শিবির থেকে মুক্তি পেলাম আমি। মালেয়শিয়ার জেলে এমন অনেক বাংলাদেশি আছেন যারা কয়েক মাস ধরে সেখানে আছেন। কিন্তু এদেশে তাদের কোনো পরিচিত না থাকায় দেশে ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না।

নাঈম আলি নামে এক বাংলাদেশি জানালেন, এসব বন্দিরা জানে তাদের নামে মামলা আছে। কিন্তু কি মামলা, তা তারা জানে না। জানতে চাইলে মারধর করা হয়। মালেয়শিয়ায় আটক বিদেশিদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনই বাংলাদেশি। বাকিরা বিভিন্ন দেশের। সেখানে কেউ একটু এদিক-সেদিক হলেই রড দিয়ে আঘাত করা হয়।

খাবার -দাবার যা দেওয়া হয়, তাতে একটা মুরগির পেটও ভরবে না। সকালে এক কাপ লাল চা আর এক টুকরো বনরুটি। দুপুরে এক মুঠো ভাত ও একটা শুকনো মাছ। সন্ধ্যায় দুপুরের মতোই খাবার। সারাদিনে শুধু এ খাবার খেয়েই মাসের পর মাস পড়ে আছে অনেকে।

হাইকমিশনের কাউকে এ পর্যন্ত ক্যাম্প পরিদর্শনে যেতে দেখেনি বলে কেউ কেউ জানালেন। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন হাইকমিশনের মাধ্যমে আটক শ্রমিকদের দ্রুত দেশে পাঠাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

twenty + 2 =