সূষ্ঠু প্রজনন ব্যবস্থাপণায় বাংলাদেশে মহিষ হতে পারে এক সম্ভাবণাময় প্রাণীঃ ড. এম. এ. এস. তালুকদার

0
1675

42596827 1948833858489321 1931350607218606080 n 225x300 - সূষ্ঠু প্রজনন ব্যবস্থাপণায় বাংলাদেশে মহিষ হতে পারে এক সম্ভাবণাময় প্রাণীঃ ড. এম. এ. এস. তালুকদার
প্রজনন করার অল্প কিছু দিনের (১৮-২০ তম দিন) মধ্যেই বায়োমার্র্কার (Bio-marker) পদ্ধতিতে গর্র্ভধারণ নির্ণয় করতে পারলেই মহিষ হতে পারে দুধ ও মাংশের জন্য এক সম্ভবনাময় প্রাণী। মহিষ প্রজননের ১৬-১৮ দিনের মধ্যে প্রায় ৬৫% ভ্রুণের (Embryonic) মৃত্যু হওয়ার কারনে সফল প্রজননক্ষম প্রাণী (Breeder) না হওয়া সত্বেও মহিষ এখনো ভারতে গবাদি প্রাণির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিকভাবে প্রজনন ব্যবস্থাপণা (Reproductive management) নিশ্চিত করতে পারলেই মহিষও অন্যান্য গবাদি প্রাণীর মতো জাতীয় অর্র্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। মহিষ প্রধানত: ট্রপিক্যাল (Trophical) এবং সাব-ট্রপিক্যাল (Sub-trophical) অন্ঞ্চলেই বেশি দেখা যায়। বিশ্বে যে পরিমান মহিষ রয়েছে তার প্রায় ৭৩.৭৭ মহিষ রয়েছে সার্র্কভূক্ত দেশসমুহে, কারন সার্র্কভূক্ত দেশসমুহে রয়েছে জীব বৈচিত্র্য, বিভিন্ন জাতের মহিষের বিশাল জার্র্মপ্লাজম এবং বিশ্বখ্যাত অধিক দুগ্ধ প্রদানকারী জাত মুরাহ ও নিলি-রাভি জাতের আধিক্য। বিশ্বে মহিষের মোট দুধের প্রায় ৯৩.১৯% দুধ দক্ষিন-পূর্র্ব এশিয়ার দেশসমূহ যোগান দিচ্ছে, যেখানে ভারত প্রায় ৬৭.৯৯% এবং পকিস্হান প্রায় ২৩.৯৬% অবদান রাখছে। মহিষের মোট মাংশ উতপাদনের প্রায় ৭১.৪% ভাগই হয়ে থাকে দক্ষিন-পূর্র্ব এশিয়ার এই সমস্ত দেশ থেকে। বাংলাদেশে প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর (Department of Livestock Service-DLS) ২০১৫ এর রিপোর্র্ট অনুযায়ী আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় ১.৪৫৭ মিলিয়ন মহিষ রয়েছে এবং কোন স্বীকৃত জাত নেই, যা আছে তা একদম দেশী প্রকৃতির। দেশে মোট দুধ উতপাদনের প্রায় ৩-৪% দুধ মহিষ থেকে সংগ্রহ হয়ে থাকে। বিশ্বে মহিষ দুধ ও মাংশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার জন্য বিগত সময়ে বাংলাদেশে মহিষ লালনপালনে খুব একটা অগ্রগতি সাধিত হয় নাই। যদিও উপকূলীয় লবনাক্ত এলাকায় দলবদ্ধভাবে একসাথে কিছু মহিষ কিছু পাল রয়েছে, যা শুধুমাত্র হালচাষ আর খুব সামান্য দুধ উতপাদনের কাজে ব্যবহার হয়। এফএও (Food and Agricultural Organization-FAO) ২০০৮ এর তথ্য মতে মহিষকে অধিক লাভজনক করতে হলে অবশ্যই মহিষের প্রতি বাচ্চা প্রদানের সময়সীমা ১৩-১৪ মাসের মধ্যেই রাখতে হবে। যদিও মহিষের রয়েছে অসাধারণ খাদ্য রুপান্তরের (feed conversion efficiency) দক্ষতা এবং কম পরিমান যত্নাদি হলেই চলে। মহিষ প্রজননের দিকে থেকে ততোটা সফল নয় কারন মহিষে রয়েছে সঠিক সময়ে প্রজনন করার সময়(Heat detection) গরম নির্ণয়জনিত সমস্যা, নীরব গরম অবস্থা (Silent heat) এবং রিপিট ব্রিডিং (Repeat breeding) সমস্যা। সঠিক ব্যবস্থাপণার মাধ্যমে মহিষের প্রজনন সমস্যা সমূহের উন্নতি ঘটানো সম্ভব যেমন-প্রথম গরম হওয়ার সময় সম্পর্র্কে অবগত হওয়া, গরমকালীন সময়ের বাহ্যিক বৈশিষ্ট সম্পর্কে ধারণা, সঠিকভাবে প্রজনন সম্পন্ন এবং গর্র্ভধারণ নির্ণয়। প্রাণি হিসেবে আমরা জানি, মহিষ একটু উচু দৈহিক গড়নের বিধায়, আমাদের দেশে প্রচলিত গর্র্ভাবস্থা নির্ণয়ের জন্য যে রেকটাল পালপেশন (Rectal palpation)পদ্ধতি রয়েছে তা মহিষের ক্ষেত্রে ততোটা ফলপ্রসূ নয়। কারণ মহিষ উচু হওয়ার কারনে সঠিকভাবে রেকটাল পালপেশন করা সম্ভব হয়ে উঠে না, অদক্ষভাবে পালপেশন এর ফলে ভ্রুণ (Embryonic) মৃত্যুর ঝুকি বেড়ে যায়। অন্যান্য পদ্ধতি গুলোর সীমাবদ্ধতার জন্য এই পদ্ধতিই এখনো গাভীর পাশাপাশি মহিষেও বহুল প্রচলিত। আমাদের দেশে আল্ট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasonography) মাঠ পর্যায়ে যোগান তথা প্রয়োগ সম্ভব নয়, তা ছাড়া এই সকল পদ্ধতির মাধ্যমে কোনভাবেই প্রজননের ৩০ দিন পরে গর্র্ভাবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। বিশ্বে এখন গবাদিপশুতে রেকটাল পালপেশন (Rectal palpation), আল্ট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasonography) এর পাশাপাশি প্রজননের পর নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ কিছু জ্বীণের (Genes) উপস্থিতির মাধ্যমে গর্র্ভধারণ নির্ণয় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং বিশেষজ্ঞগণ প্রজনন করার কম সময়ের মধ্যে এ জঠিল সমস্যা সমাধানের পথ বের করার জন্য সেদিকেই বেশি ঝুকঁছেন। বিশেষ সময় বলতে, আমরা জানি গাভী, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া রোমন্থক (Ruminant) প্রাণী, এদের ডিম্বাণূ (Ovum), শুক্রাণু (Spem) দ্বারা সফল নিষিক্তকরণ (Fertilization) হলে যে কনস্পেটাস (Conceptus) তৈরী হয় তা থেকে গর্র্ভধারণের ১৪ দিনের পর হতে ইন্টারফেরণ টাউ (Interferon tau-IFNT) নামক এক ধরণের প্রোটিন নি:সৃত হয়। এই ইন্টারফেরণ টাউ প্রোটিন রোমন্থক (Ruminant) প্রাণীর জরায়ু-কনস্পেটাস এর মধ্যে গর্র্ভধারণ সিগন্যাল (Novel Pregnancy recognition signal)হিসেবে কাজ করে। জরায়ুতে কনস্পেটাস বৃদ্ধির সাথে সাথে এই প্রোটিন নি:সরণের মাত্রা বেড়ে যায় এবং প্রজননের পর ১৬-১৮তম দিনে(যদি গভর্র্ধারণ হয়) তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে এরপর ধীরে ধীরে কমতে খাকে। এই প্রোটিনের প্রভাবে বিশেষ কিছু জ্বীন (Interferon stimulated genes-ISG15, MX1 & MX2) গর্র্ভবস্থার প্রথম দিকে জরায়ু এবং রক্তের লিউকোসাইট কোষে প্রকাশ হয়ে থাকে। এই প্রোটিন অন্যান্য রোমন্থক (Ruminant)প্রাণীরও (ছাগল ও ভেড়া) প্রেগন্যান্সি রিকগনিশণ সিগন্যাল (Pregnancy recognition signal) হিসেবে কাজ করে।
সূখবর হলো জরায়ুতে এই প্রোটিন এর উপস্থিতি, এর প্রভাব নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং প্রমাণিত হয়েছে। বর্র্তমানে এই প্রোটিন জরায়ু থেকে রক্ত নালীর মাধ্যমে প্রাণীর দেহের মূল রক্ত প্রবাহে প্রবাহিত হচ্ছে এবং লিউকোসাইট কোষে (Blood Leukocytes) বিশেষ জ্বীণসমূহের (Genes-ISG15, MX1 & MX2) উপস্থিতি সনাক্ত হয়েছে। এই গবেষণার ফলে হয়ত: আগামীতে খুব সহজেই এক ফোটা রক্তের নমূনা সংগ্রহ করে খামার/মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে গর্র্ভবস্থার (Pregnancy status) ফলাফল জানা সম্ভব হবে। জাপানে আমাদের গবেষণা দল গাভীতে এ ধরণের গবেষণা সম্পন্ন করেছে, কিন্তু মহিষে এখনো তেমনভাবে এ গবেষণা বেশি দূর এগোয়নি। আশার কথা হলো ভারতে কিছু গবেষকের গবেষণার প্রকাশনায় তাঁরা মহিষে প্রাথমিকভাবে স্বল্প পরিসরে এ ধরণের জ্বীণের উপস্থিতি পেয়েছে এবং তা জার্র্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে অদ্যবধি এ ধরণের গবেষণা কাজ শুরু করা সম্ভব হয় নাই, হয়ত: আগামীতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়টি নিয়ে ভাববেন। এ সকল গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতার (Limitations) কারণে এখনো পুরাপুরি সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৈাছানো সম্ভব হয়নি। আশা করছি, গবেষকদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে অল্প কিছু সময়ের মধ্যে মানুষের মতো বিশেষভাবে প্রস্তুত কীটের (Pregnancy detection kit) মাধ্যমে গবাদী প্রাণীতেও সহজেই গর্র্ভাবস্থা নির্ণয় করা যাবে। অন্য রোমন্থক প্রাণী ভেড়াতেই প্রথম ইন্টারফেরণ টাউ (Interferon tau-IFNT) প্রোটিনের অস্তিত্ব সনাক্ত হয়, এ নিয়ে বিশ্বে অনেক গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। ছাগলে খুব সীমিত আকারে এ ধরণের গবেষণার তথ্য প্রকাশ হয়েছে, তবে আমাদের দেশে ছাগলের প্রাচুযর্তা এবং জনপ্রিয়তা হিসেবে এই ধরণের গবেষণার মাধ্যমে গর্র্ভধারণ নির্ণয়ের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। যদি এই ধরণের গবেষণার ফলাফল মহিষের গর্র্ভধারণ নির্ণয়ে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে বর্র্তমানে মহিষ লালন পালনে তথা উতপাদনে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা অনেকাংশে সহজ করে মহিষকে এক সম্ভাবনাময় প্রাণী হিসেবে সামনে এগিয়ে নেয়া যেতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সরকারী এবং বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা, গবেষণার অবকাঠামোগত সুবিধা ও সুষ্ঠু পরিবেশ। সরকারী কিংবা বেসরকারীভাবে যে কোন প্রতিষ্ঠানই আগামীতে মহিষ এর উপর প্রকল্প গ্রহণ করেন না কেনো অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ সেখানে মহিষের এই গুরুত্বপূর্র্ণ প্রজনন দিকটির সূষ্ঠু ব্যবস্থাপণার বিষয়টি সঠিকভাবে খেয়াল করবেন এবং সঠিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন। অন্যথায়, সম্ভাবনাময় এই খাতটি থেকে কাংখিত সূফল পাওয়া দূরুহ হয়ে পড়বে।

লেখক:
গবেষক, হোক্কাইডো ইউনিভার্সিটি
সাপ্পোরো, জাপান।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

three + 17 =